আপন ভাগ্য জয় হল কতটা, প্রশ্নটা রয়েই গেল নারী দিবসে

অমিত মিত্র

0
119

হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে পাশাপাশি হাঁটছি আমরা। তবু আজও ভারসাম্যে পৌঁছল না দুই অস্তিত্ব। নারীর জন্য আজও দুই চরম পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিকোণে বিভাজিত এ সভ্যতা। সমাজের এক পিঠে তাঁকে মা অথবা মেয়ে, স্ত্রী অথবা বোন হিসেবে দেখা হয়। সমাজের অন্য পিঠে হয়ে চলে তার নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ।

international-womens-day-2017-health-mental_650x400_81488892403নারীকে আপন ভাগ্য জয় করার অধিকারের কথা তাঁর কবিতায় বলেছিলেন কবিগুরু। রবীন্দ্রনাথের পথ বেয়েই নজরুল লিখেছিলেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” কিন্তু সত্যিই কি তাই ? বিচ্ছিন্ন ভাবেই হোক বা সংগঠিত ভাবে, নারীর অসামান্য অর্জনের যে সব কাহিনি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পৃথিবীর আকাশে, সে সবই অকুণ্ঠ প্রশংসা পায়। কল্পনা চাওলা থেকে সুনীতা উইলিয়ামস, সাইনা-সানিয়া থেকে সিন্ধু-দীপা— মুকুটের মণি হয়ে ওঠেন তাঁরা। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও ঘরে ঘরে বাধা পায় নারীর উড়ানের আরও হাজার হাজার চেষ্টা। এ কথা মানতে হবে যে নগর-জীবনের পরিসরে আজ নারীর স্বরাজ অনেক বেশি, নারীর অস্তিত্ব অনেক সাবলীল। কিন্তু নগর সভ্যতার বাইরে যে বিশাল বিস্তার জুড়ে গ্রামীণ জনজীবনের অবস্থিতি, সে বিস্তার পুরুষতন্ত্রের সবক’টা অনাকাঙ্ক্ষিত বেষ্টনীকে এখনও ধরাশায়ী করে দিতে পারেনি। তাই নারী দিবস পালিত হয়, আসে-যায়, কিন্তু নারী-পুরুষের অস্তিত্বে ভারসাম্য অধরাই থেকে যায়। আজও কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়, আজও সদ্যোজাত কন্যার মুখে নুন ঢেলে দেওয়া হয়, আজও পণের দাবিতে জুলুম হয়, আজও কন্যাসন্তান জন্মানোর খবরে পরিবারের মুখ ভার হয়। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া কন্যাকে অনায়াসে ফেলে দেওয়া হয় আবর্জনার স্তূপে।

সমাজমানসে আসলে পিতৃতন্ত্রের গভীর ছায়াপাত রয়েছে এখনও। স্থানে স্থানে সভ্যতার শিকড়টাকে পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্রের মাটি আজও আঁকড়ে রয়েছে খুব শক্ত করে। তাই নারী বৃহদংশের কাছেই আজও হয় আগলে রাখার সম্পদ, না হয় যথেচ্ছাচারের উপকরণ। নারীর অস্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তো নারীকে কোনও বিশেষ চরিত্র হিসেবে দেখতে হয় না। নারী তাঁর সব রকমের নিজস্বতা এবং বৈশিষ্টের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র ও মৌলিক অস্তিত্ব— এইটুকু ভাবতে শিখলেই বোধহয় যথেষ্ট এ সমাজ, এ সভ্যতার।

সেই পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র এবং মৌলিক অস্তিত্বের জন্য নিবেদিত যে তারিখটা, সেই দিনটায় মেয়েদের লড়াই, মেয়েদের অর্জন, মেয়েদের উত্থান, মেয়েদের সুখ-দুঃখ, মেয়েদের বারোমাস্যা— নারীর জীবনের নানান রঙের ঔজ্জ্বল্য নতুন করে ছড়িয়ে পড়ুক আকাশ জুড়ে, ছাপিয়ে যাক দিগন্তরেখা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এমনই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY