চাকায় চাকায়

পর্ব ১

0
270

দুচাকায় ভর করে বেরিয়ে পড়া। এ এক অন্য রোমাঞ্চ। সেই রোমাঞ্চকেই প্লাস বাংলায় তুলে ধরলেন সুব্রত গোস্বামী। লেখা পড়ে, ছবি দেখে ঘরে বসেও হতে পারে আপনার মানস ভ্রমণ। আজ প্রথম পর্ব।

কালী পুজোর দিন তিনেক পেরিয়েছে সবে। তখনও শহরে শীত ঢোকেনি। বেরিয়ে পড়লাম চারজন। মোটরবাইক নিয়ে। প্ল্যান, ওড়িশার গোপালপুর, অন্ধ্রের আরাকু হয়ে ছত্তিসগড়ের চিত্রকূট গিয়ে আবার ওড়িশায় ঢুকে সাতকোশিয়া, বাংরিপোসি হয়ে বাড়ি। দিন দশেকের হিসেব। রিটার্ন টিকিটের হ্যাপা নেই, কোথাও থেকে যেতে ইচ্ছে হলে দিন বাড়বে। একটা বেড়ানোকে স্বর্গীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিতে এর থেকে বেশি আর কী প্রয়োজন। চারটে বাইক, পেছনে স্যাডল ব্যাগ আর চারজন সওয়ার। রানাদা, অশোকদা, চির আর আমি।

IMG_20151118_105110অন্যবারের মত ভাল্লাগছেনা বলে একটু বেরিয়ে পড়ে, দূরে গিয়ে কলকাতার জন্য মন কেমন করাবো, আর আবার ছুটে আসব বলে এই বেড়ানোটা ছিলনা কিন্তু। আইআরসিটিসিতে দু-মাস আগে টিকিট বুকিং, মিডল বার্থের লোকটা সাড়ে আটটা অব্দি ঘুমোবে বলে থ্রি-টায়ারে ঘাড় নিচু করে বসে থাকা, সাইট-সিয়িং এর গাড়িতে সামনের সারির উইণ্ডো সিট না পাওয়ার যন্ত্রণা, এসব কোনো কিছুর পরোয়া ছিলনা এ জার্নিতে। হ্যাঁ জার্নি। চলার পথে যে জায়গাটা চোখে ধরবে সেখানেই থমকে গিয়ে তাকে মনে ধরানোর জার্নি। চলতে চলতে যেদিকে চোখ যায় সেদিকে চেয়ে থাকার জার্নি।

IMG_20151116_115012বম্বে রোড দিয়ে যাওয়া আর আজাদ-হিন্দ-ধাবায় ব্রেকফাস্ট করার রীতির অন্যথা এবারেও হলনা। সেই একই মেনু, তন্দুরী রুটি, তড়কা, মিক্সড ভেজ আর অমলেট। ও হ্যাঁ চাও ছিল। চা খেয়েই আবার বাইক স্টার্ট দেওয়া।

IMG_20151115_080800গন্তব্য ভদ্রক ছাড়িয়ে চণ্ডিখোল। কটকের কাছেই একটা জায়গা। চণ্ডিখোল পৌঁছতে পৌঁছতে রাত সাড়ে-আটটা বেজে গেল। জীবনের এক দশমিক এক পাঁচতম লং বাইক জার্নির প্রথমেই একদিনে চারশ ষোলো কিলোমিটার বাইক চালিয়ে ফেললাম। আসলে প্রথমে ঠিক হয়েছিল ভদ্রকে থাকা হবে। ভদ্রক আমরা বিকেলে আলো থাকতে থাকতেই পেরিয়ে এসেছি। বন্ধু রাজুদার কাছে এই পথের অভিজ্ঞতা আমরা শুনে এসেছিলাম। ওরা যখন এসেছিল চণ্ডিখোলের যে হোটেলে ছিল, আমরাও সেই হোটেলটাই খুঁজে বের করলাম। জমজমাট জায়গায় হোটেল। সস্তার শেষ কথা। চার’শ টাকায় অত বড় বড় মাথা খুঁড়লেও পাওয়া দায়।

IMG_20151116_154334

এখানে শুধু রাতটুকু কাটিয়ে পরদিন ভোর ভোর বেরিয়ে পড়তে হবে গোপালপুরের উদ্দেশ্যে। অতএব খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। তবে ঘুমোনোর আগে আমার এক দশমিক এক পাঁচতম লং বাইক জার্নির ব্যাপারটা খোলসা করে দিই। বছর আটেক আগে বউ নিয়ে একবার মন্দারমণি আর একবার অ্যাডভেঞ্চার কোর্সের গেট-টুগেদারে কৃষ্ণনগরের বনগ্রাম। এটাকে এক ধরলে ওগুলোকে যথাক্রমে দশমিক এক আর দশমিক শুন্য পাঁচের বেশি ধরতে পারছিনা।

কাকভোরে চণ্ডীখোল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। বেশ কিছুদূর বাইকিং করার পর চিলিকার কাছাকাছি একটা জায়গা‍য় এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম হাইওয়ের ধারের সৌন্দর্য্যেরা হাত বাড়িয়ে আছে জড়িয়ে ধরবে বলে। আগের দিনের বেশকিছুটা পথ অতিরিক্ত চালিয়ে ফেলা, পরদিন আমাদের সময় নষ্টের বিলাসীতা করার একটা অনুমোদন দিয়েই রেখেছিল। জানা নেই সামনে কত সৌন্দর্য্য অপেক্ষা করছে। যা দেখছি তাতেই বিভোর হয়ে ক্লিক শব্দে ছুটে চলা ট্রাকের আওয়াজকে টেক্কা দিচ্ছিলাম আমরা। হেলেদুলেও দুপুর দুপুর গোপালপুর পৌঁছব সেটুকু বিশ্বাস সকলেরই ছিল। যাক চোখ, ক্যামেরা ও মোবাইল দিয়ে প্রকৃতি দেখার পালা চুকিয়ে আবার বাইক স্টার্ট দিলাম আমরা। মসৃণ রাস্তার প্রশংসা করতে “মাখন-এর মত” ছাড়া অন্য বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে বলতেই হচ্ছে, “মাখনের মত রাস্তা”। এমন মাখনসম পথে আশি-নব্বইয়ের নীচে গাড়ি চালানোই দায়। মসৃণ হাইওয়ে মিশে যায় দূরের পাহাড়ে, আর আমরা চলতে থাকি। সিনিক বিউটিরা কখোনো আবার ডানপা টাকে ব্রেক লিভারে চাপ দিতে বাধ্য করায়। চলতে থাকে ফটো সেশন। খানিক বিশ্রামের পর আবার চলা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY